মহান বিজয় দিবস উদযাপন

যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে আজ উদযাপিত হল মহান বিজয় দিবস। জাতি গভীর শ্রদ্ধা এবং ভালবাসার সাথে ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়ে স্মরণ করল জানা অজানা সেইসব শহীদদের যাদের সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের প্রিয় স্বাধীনতা। একই সাথে কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করল বেঁচে থাকা সকল মুক্তিযোদ্ধাদেরও।

লাখো প্রাণের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর অর্জিত বিজয়ের আনন্দকে রোমন্থন করতে প্রতিবছর দেশজুড়ে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হয়ে আসছে আমাদের বিজয় উৎসব।

সাভার সৃতিসৌধে জাতীয় পর্যায়ে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে শুরু হয় আমাদের বিজয় উৎসব।

ভোরের সূর্যোদয়ের পরপরই রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ ৬টা ৩৪ মিনিটে সর্বপ্রথম সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান শহীদদের প্রতি। এরপর পুষ্পস্তবক অর্পন করেণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সমগ্র জাতির পক্ষ থেকে শহীদদের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর পর তারা দুজনে সেখানে কিছুক্ষন নিরবে দাড়িয়ে থাকেন। স্মৃতিসৌধ বেদীতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি চৌকস দল তাদেরকে রাষ্ট্রীয় অভিবাদন জানায়। এসময় বিউগলে করুণ সুর বেজে ওঠে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর দলের পক্ষ থেকেও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের সাথে নিয়ে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

এসময় জাতীয় সংসদের স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রীপরিষদসদস্যবৃন্দ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, তিনবাহিনী প্রধানগণ, মুক্তিযোদ্ধা, কূটনীতিক, বিভিন্ন উন্নয়ন অংশীদারদের প্রতিনিধি এবং উচ্চপর্যায়ের সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এরপর পর্যায়ক্রমে বীরশ্রেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবার, পঙ্গু মক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয় ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাভার স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পনের পর সেখান থেকে রাজধানীর ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের সামনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।

৪৫তম মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে একাত্তরের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। সকাল ১০.৫৬টায় তিনি দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন- বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহ, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান, ড. আবদুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ওসমান ফারুক, আবদুল কাইয়ুম, ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর, যুগ্ম মহাসচিব এ্যাডভোট রুহুল কবির রিজভী, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনসহ দলের নেতাকর্মীরা।

বেগম খালেদা জিয়া স্মৃতিসৌধে পৌঁছার আগে থেকেই স্থানীয় নেতাকর্মীরা স্মৃতিসৌধে জড়ো হন। স্মৃতিসৌধের বেদী থেকে মহাসড়ক পর্যন্ত একপাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে নেতাকর্মীরা তাকে স্বাগত জানান।

স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে খালেদা জিয়া শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এসময় তিনি ফাতেহা পাঠ করেন এবং জিয়াউর রহমানের রুহের মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাত করেন।

মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অপর্ন করে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যান্য ভিআইপিবৃন্দ স্মৃতিসৌধ থেকে বের হয়ে যাবার পর বাইরে অপেক্ষমান সাধারন মানুষের জন্য খুলে দেয়া হয় জাতীয় স্মৃতিসৌধের গেট।

এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক, সংস্কৃতিক, পেশাজীবী সংগঠনসহ সর্বস্তরের মানুষ নানা ধরনের ব্যানার, রং বেরংয়ের ফেস্টুন, বেলুন এবং বর্ণিল সাজে সজ্জিত হয়ে প্রবেশ করতে থাকেন জাতীয় স্মৃতিসৌধে। একে একে সারিবদ্ধ হয়ে অর্পন করতে থাকেন ফুলের ডালা। ফুলে ফুলে ভরে উঠতে থাকে স্মৃতিসৌধের পাদদেশ।

কুচকাওয়াজ :
ঢাকায় ৩১ বার তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে বিজয় দিবসের সূচনা হয়। বিজয় দিবস উপলক্ষে সকাল সাড়ে ১০টায় তেজগাঁও পুরনো বিমানবন্দরে অবস্থিত জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে বীর মুক্তিযোদ্ধা, সশস্ত্র বাহিনী ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের অংশগ্রহণে এক বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ কুচকাওয়াজে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি সালাম গ্রহন করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশেষ অতিথি হিসেবে এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে মনোমুগধ্কর কুচকাওয়াজ উপভোগ করেন।

প্রায় দুই ঘণ্টা স্থায়ী আকর্ষণীয় প্যারেড অনুষ্ঠানটি সর্বস্তরের হাজার হাজার লোক প্রত্যক্ষ করেন।

রাষ্ট্রপতি খোলা জীপে করে বিজয় দিবসের প্যারেড পরিদর্শন এবং সালাম গ্রহণ করেন। প্যারেড কমান্ডার মেজর জেনারেল ওয়াকার উজ জামান এ সময় রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ছিলেন। সেনা ও নৌ বাহিনীর বিমান এবং র‌্যাবের হেলিকপ্টার নয়নাভিরাম ফ্লাইপাস্ট প্রদর্শন করে। বিমান বাহিনীর এ্যারাবেটিক শো’ এবং সেনা বাহিনীর প্যারাট্রুপারদের প্যারাস্যুট ব্যবহার করে অবতরণ দর্শকদের মুগ্ধ করে।

সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী, পুলিশ, কোস্টগার্ড, আনসার, বিজিবি, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর, প্যারেডে অংশগ্রহণ করে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এ উপলক্ষে তাদের কর্মকা- প্রদর্শন করে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় চার নেতা এবং সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের প্রতিকৃতি দিয়ে প্যারেড গ্রাউন্ড সজ্জিত করা হয়।

বিমান বাহিনীর মিগ-২৯ বিমানের চমৎকার ফ্লাইপাস্ট এবং ব্যান্ড বাদকদের শুভেচ্ছা সঙ্গীতের মধ্যে দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়।

প্রধানমন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে রাষ্ট্রপতি প্যারেডে অংশগ্রহণকারী কন্টিনজেন্টের নেতাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ সকাল সাড়ে দশটায় প্যারেড গ্রাউন্ডে উপস্থিত হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এবং তিন বাহিনীর প্রধানগণ তাকে স্বাগত জানান।

প্রধান বিচারপতি, সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদ, মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবর্গ, বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র ও তার আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ও কন্যা সায়মা হোসেন, মুক্তিযোদ্ধাবৃন্দ ও উচ্চপদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ভারত থেকে আগত ২৭ জন মুক্তিযুদ্ধের বীর এতে যোগ দেন।

বিজয় দিবস উপলক্ষে সকল সরকারি, আধাসরকারি ও সায়ত্ত্বশাসিত এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ সব ভবন ও স্থাপনায় আলোকসজ্জা করা হয়।

অন্যদিকে, জাতীয় পতাকা, রঙ্গীন ফেস্টুন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের স্মৃতিময় বিভিন্ন ঘটনার ছবি সম্বলিত ডিজিটাল ব্যানার দিয়ে সকল গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সড়কদ্বীপ সজ্জিত করা হয়েছে।

দিনটি উপলক্ষে মহান মুক্তিযুদ্ধের তাৎপর্য প্রকাশ করে রাষ্ট্রায়ত্ব ও বেসরকারি টেলিভিশন ও রেডিও চ্যানেলগুলো বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচার করছে।

বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, বাংলাদেশ শিশু একাডেমী আলোচনাসভার আয়োজন করে এবং মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। অন্যদিকে, বিজয় দিবস উপলক্ষে ডাক বিভাগ স্মারক ডাকটিকেট প্রকাশ করেছে।

বিজয় দিবস উপলক্ষে সারাদেশে হাসপাতাল, কারাগার, শিশুসদন, এতিমখানা, ভবঘুরে আশ্রয়কেন্দ্র প্রভৃতিতে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হয়েছে। আজ বিজয় দিবসে বিনামূল্যে শিশুদেরকে রাজধানীর শিশুপার্কে প্রবেশ করতে দেয়া হয়।



মন্তব্যসমূহ